বই সমালোচনা

 

জীবন বনাম রাষ্ট্রশক্তিঃ বর্তমান অস্থির সময় ও মেঘা মজুমদারের আ বারনিং

                                            

      একটি ট্রেন দাউ দাউ করে আগুনের শিখায় জ্বলছে। কলাবাগান রেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটায় কেউ বা কারা রাতের অন্ধকারে আগুন লাগিয়ে চলে গেছে। বাড়িতে ফিরে জীবন তার নতুন কেনা স্মার্টফোনে ফেসবুকে লগ ইন করে দেখল, অনেকেই এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে পরে মুখ্যমন্ত্রি বিবৃতি দেন দোষীদের অবিলম্বে শাস্তি দেওয়া হবে। ঘটনার তদন্ত ভার পুলিসকে দেওয়া হয়েছে। সেই ভিডিওটি অনেকে শেয়ার করেছে। ইতিমধ্যে আরেকটি ভিডিও তার নজরে আসে। এক ভদ্রমহিলা অসহায় অবস্থায় ভেঙ্গে পড়ে কেঁদে বলছেন তার স্বামী মেয়ে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে গেছে ট্রেনের কামরায়। নির্বাক পুলিস দুরে দাঁড়িয়ে দেখেছে। তবুও কেউ এগিয়ে আসেনি। জীবন এই পোস্তটি শেয়ার করল তার ফেসবুক পেজে। সাথে লিখে দিল একটি বার্তা সর্বসকলের জন্য।রাষ্ট্রের পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখল তবুও কিছু করলনা যখন এই মহিলা তার সবকিছু হারিয়ে ফেলল।এই পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। আমরা অনেকেই এই রকম পোস্ট ফেসবুকে দিয়ে থাকি। এই ভিডিওটি খুব দ্রত অনেক অনেক লাইক পেয়ে গেল।এরপরই জীবন একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলল। একটা সাংঘাতিক ব্যাপার যেটা কল্পনা করাও বিপদ, লেখা দুরের কথা। তবুও সে লিখে ফেলল, “যদি পুলিশ এই সাধারণ মানুষদের সাহায্য না করে তাদের মৃত্যুর হাতে, ছেড়ে দেয়, তার মানে কি এইটা দাঁড়ায় না যে রাষ্ট্র নিজেও এক আততায়ী?” (If the police didn’t help ordinary people like you and me, if the police watched them die, doesn’t that mean, I wrote on Facebook, that the government is also a terrorist?”)

      এরপর যা হবার তাই হয় কয়েকদিন বাদে জীবনকে রাতের বেলা পুলিশ বাহিনী এসে নিয়ে চলে যায় প্রশ্ন করলে সে উত্তর পায়না কিছুদিন বাদে তাকে আদালতে পেশ করা হলে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সে জানতে পারে তার নতুন পরিচয় কলাবাগান বিস্ফোরণে সে পুলিশের হাতে ধৃত সেই আততায়ী যাকে পুলিশ খুঁজছিল ঘটনার পর থেকে শুরু হয় তার বিরুদ্ধে মামলা রাষ্ট্র বনাম জীবন মেঘা মজুমদারের সাম্প্রতিক এই উপন্যাশ এক অর্থে সাড়া জাগানো ভারতে ঘটে যাওয়া বিগত কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র যেখানে খুব সহজেই কাউকে দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে দেয় তারপর তার ওপর চলে নির্মম অত্যাচার এবং অবশেষে শাস্তি নেমে আসে কিন্তু সত্যিটা কি কখনও জানা যায়? সুদুর মার্কিন প্রদেশে অবস্থান করেও বাঙালি মেয়ে মেঘার প্রকাশিত প্রথম উপন্যাশে এই ভাবেই কিছু প্রশ্ন উঠে আসে পাঠকের জন্য এবং উপন্যাশের বুনোটে অতঃপ্রত ভাবে জড়িয়ে থাকে বর্তমান ভারতে ঘটে যাওয়া রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক হিংসা, গো-বলয় রাজনীতি উগ্র জাতিয়তাবাদের ঢক্কানিনাদ

      গল্পে আছে আরও দুটি চরিত্র একজন কিন্নর এক শারীরিক শিক্ষার মাস্টারমশাই পি টি স্যার কিন্নর চরিত্রের লাভ্লি অভিনেত্রি হতে চায় তার স্বপ্ন সে একদিন নামি সিনেমায় অভিনয় করবে, তার নামডাক হবে সে আর জীবন একই বস্তির বাসিন্দা, কলাবাগান রেল স্টেশনের পাশে সে অভিনয় শিখতে যায় একটি অভিনয় স্কুলে জীবন তাকে অবসর সময়ে ইংরেজি পড়ায় সে জানে ভাল অভিনেত্রির ইংরেজির দক্ষতাও দরকার লাভ্লির সংলাপে মেঘা ভাঙ্গা মিশ্র ইংরেজি ব্যাবহার করেছেন তার ন্যারেটিভে ইংরেজিতে এটাকে pidgin English অনেকে বলে থাকেন ইংরেজি নাট্যকার জর্জ বারনাড বা আমেরিকান উপন্যশিক উইলিয়াম ফকনার এই ধরনের মিশ্র ইংরেজি ব্যাবহারের পণ্ডিত ছিলেন মুলত চরিত্রের আর্থ- সামাজিক অবস্থান ব্যাক্ত করতে তার শ্রেণির পরিচয়ের সম্যক ধারণা ফুটিয়ে তুলতে লেখক এই কাজটি করে থাকেন আর আছে পি টি স্যার স্থানীয় এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে তিনি পিটি টিচার ঘটনাচক্রে তিনি জীবনের মাস্টার মশাইও মেয়েদের স্কুলে পিটি টিচারের স্পোর্টসের দিন ছাড়া বিশেষ গুরুত্ব থাকেনা পিটি স্যারের জীবন নিস্তরঙ্গ কিন্তু হিন্দুত্ববাদি জন কল্যাণ পার্টির জন সভায় গিয়ে একদিন তার জীবন বদলে যায় কপালে তিলক লাগিয়ে যখন সে ট্রেনে করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে লক্ষ করে যে ঝাল্মুরিওয়ালা তার থেকে টাকা নিতে চাইছে না তাকে পার্টির লোক ভেবে তখনই সে ক্ষমতার স্বাদ পায়

      উপন্যাসের পরতে পরতে মেঘা বুনেছেন এক আশ্চর্য আকাঙ্খার কথা যা প্রতিটি মানব মনে অন্তরনিহিত থাকে সেই সুপ্ত শ্রেণি উত্তরণের চাহিদার পথে পা বাড়িয়ে কি ভাবে আমরা এগিয়ে চলব, সেইখানেই চলে আমাদের মনের মধ্যে লড়াই তিনজন চরিত্রই বেরোতে চেয়েছিল তাদের শ্রেণী ভেঙ্গে- গরীব জীবন যে একটা সুপার মার্কেটে সেলস গার্ল হিসেবে কাজ একদিন করত স্বপ্ন দেখেছিল সেই ষ্টোরের ম্যানেজার হবার, লাভ্লি একজন নামকরা অভিনেত্রি হয়ে সাফল্য অর্জন করতে চেয়েছিল সমাজে,  আর পিটি স্যার তার ছাপোষা চাকরির বাইরে বেরিয়ে এসে চেয়েছিল ক্ষমতার আস্বাদন করতে তিনটি চরিত্র তিনটি কণ্ঠ হয়ে ওঠে গল্পের এবং একে অন্যের সাথে এসে মেশে একদম শেষে তখন দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এই আকাঙ্খা বনাম নৈতিক আদর্শবোধের, ব্যাক্তিগত মূল্যবোধ বনাম কাঙ্খিত স্বপ্নের হাতছানি কতখানি তফাৎ থাকে এই দুয়ের মধ্যে?

      গল্পের কেন্দ্রে থাকা জীবন এক সংখ্যালঘু পরিবারে বড় হয়ে ওঠে অনেক ছোটবেলায় তাদের পৈতৃক ভিটে কয়লা মাফিয়াদের হাতে চলে যায় কিন্তু অন্যায় রোখার দায়িত্ব যে পুলিশের হাতে, তারাই সেদিন জীবন, তার বাবা মা এবং আরও অসহায় মানুষের ওপর অত্যাচার করে তাদের ভুমিচ্ছেদ করে দেয় বাস্তুহারা অবস্থায় সবাই চলে আসে কলাবাগান বস্তির ছোট্ট একটা বাসায় বন্দী অবস্থায় জীবন তার সংগ্রামের কথা সাংবাদিক পুরনেন্দু সরকারকে জানায় এই ভেবে যে তার কষ্টের কথা সবাই শুনলে তার ওপর দেশদ্রোহীর তকমা মুছে যাবে কিন্তু সংবাদ মাধ্যম তা বিক্রিত করে প্রকাশ করে লেখা হয় জীবন তার দোষ স্বীকার করেছে, সে নিজেই অপরাধী কলাবাগান বিস্ফোরণ কাণ্ডে পরে আদালতে পুলিশ কিছু কেরসিনে ডোবানো জামা কাপড় পেশ করে যা জীবনের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় বলে দাবি করা হয় সাথে তার ফেসবুক চ্যাট থেকে প্রমাণ করা হয় যে সে এক জঙ্গি সংগঠনের সাথে যুক্ত এবং এক ব্যাক্তির সাথে যোগাযোগ রাখত নিয়মিত

      মেঘার লেখায় বারবার রাষ্ট্র শক্তির অসীম ক্ষমতার কথা উঠে আসে এবং প্রশ্ন জেগে ওঠে- কোনটা সত্যি? এবং সেই সত্যিটা সামনে নিয়ে আসার দায়িত্ব যে সংবাদ মাধ্যমের হাতে, তারাও কি ভয় পেতে শুরু করেছে রাষ্ট্রকে? নাকি তারা নিজেরাও রাষ্ট্র শক্তির কাছে নিজেদের বিক্রি করে দিয়েছে? গরীবের পাশে দাঁড়ানোর মত কি তাহলে সত্যি কেউ নেই?  উপন্যাস জুড়ে মেঘা এরকম কিছু অমীমাংশিত প্রশ্ন রেখে গেছেন পাঠকের উদ্দেশে এক  সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, “আমি চেয়েছিলাম বইটা আবেদন করুক তাদেরকে যারা কোনদিনও ভারতে আসেননি এবং ভারতের ঘটনা সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই আবার তাদেরও যারা আজীবন ভারতে থেকেছেন আমি চেয়েছিলাম বইটা একটা আহবান হোক, কল্পনার দরজা উন্মুক্ত করে অসঙ্খ জটিল গল্প অনুসরণ করার “ ( I wanted the book to be legible and inviting to those who have never been to India and do not follow Indian news, as well as to those who have lived in India all their lives. I wanted the book to be an act of invitation, to open imaginative doors to the many different, complex stories that one might follow. [2]

        এই অস্থির সময়ে যখন মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বারবার আঘাত আসছে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে আসছে তাত্বিক শ্রেণীর ওপর (তেলেগু কবি  ভারভারা রাওের জেলে যাওয়া, এম এম কাল্বুরগির হত্যা, গৌরি লঙ্কেশ হত্যা কাণ্ড প্রমুখ), যখন অসহিস্নুতা চারিপাশে প্রকট হয়ে উঠছে, সাম্প্রদায়িক হিংসার আগুন দেশের শান্তি নষ্ট করতে উদ্দত এবং উগ্র জাতিয়তাবাদের মেঘ আমাদের চিন্তা গ্রাস করেছে, মেঘার এই উপন্যাস আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে জীবনের গল্প যেন আমাদেরই বেদনার প্রতিচ্ছবি হয়ে যায়

 

মূল বই- বারনিং

লেখক- মেঘা মজুমদার

প্রকাশক- পেঙ্গুইন হামিশ হ্যামিল্টন

প্রকাশনা তারিখ- ১৭ জুন, ২০২০

পৃষ্ঠা- ৩০৪

 


Comments